সেদিন, সোমবার দুপুরে স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন দ্বিতীয় তলায় ক্লাসরুমে ছিলাম, আমার সঙ্গে সাত-আটজন ছাত্র। বেশিরভাগই অষ্টম শ্রেণির। হঠাৎ বিকট এক শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক। প্রথমে মনে হলো বজ্রপাত, কিন্তু আকাশ তো পরিষ্কার। এরপরই পাশের নারকেলগাছে আগুন দেখতে পেলাম। বুঝলাম, কিছু ভয়াবহ ঘটেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল ভবনের বিভিন্ন স্থানে, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আমি যে কক্ষে ছিলাম, সেটি ভবনের পশ্চিম দিকে। পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমি ছাত্রদের নিয়ে পাশের ওয়াশরুমে আশ্রয় নিই। তখনই মনে পড়ল, ওই পাশে একটা লোহার ‘পকেট গেট’ আছে। সাধারণত সেটিতে তালা দেওয়া থাকে—সেদিনও ছিল। তবে গেটের লোহা ছিল চিকন। ভাবলাম, দেয়াল তো ভাঙা যাবে না, গেটটাই যদি ভাঙা যায়!
ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বুক কেঁপে উঠছিল। সবার চোখে ভয়, আতঙ্ক—কেউ কাঁদছে, কেউ চিৎকার করছে "বাঁচান স্যার!" এই সন্তানের বয়সী শিশুদের মুখ আমি ভুলতে পারি না।
আমি গেট ভাঙার চেষ্টা করছিলাম, তখন দেখি একজন ছেলে দৌড়ে আসছে বারান্দা দিয়ে, তার শর্টে আগুন লেগে গেছে। সে কাঁদছে, "স্যার, আমাকে বাঁচান!" তাকে ধরতেই আমার হাত পুড়ে যাচ্ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের বললাম, ওর গায়ে পানি ঢালো, আর আমি গেট ভাঙার চেষ্টা করি।
প্রাণপণ চেষ্টা করে, লাথি মারতে মারতে একপর্যায়ে গেটের কিছু লোহা বাঁকা করে একটা মানুষের বের হওয়ার মতো জায়গা তৈরি করতে পারি। গেটের পাশে একটা আমগাছ ছিল, ওটা ধরে দু-একজন নিচে নামে। পরে বাইরে থাকা লোকজন গাছে উঠে বাকিদের নামিয়ে নেয়। এই পুরো ঘটনাটা সম্ভবত তিন মিনিটের। কিন্তু সেই তিন মিনিট যেন আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, ভয়াবহ সময়।
নিচে নেমে দেখি, পুরো ভবন জ্বলছে। তখনই প্রথম বুঝতে পারি, ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। আগেই বোঝা যায়নি। বিমানের শব্দ পাইনি, শুধু দুইবার বিকট বিস্ফোরণের শব্দ—একবার ধাক্কার, আরেকবার সম্ভবত জ্বালানির বিস্ফোরণ।
আমার চোখের সামনে ছাত্রছাত্রীরা আগুনে পুড়ে গেছে। কেউ কেউ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে হাসপাতালে। এক সহকর্মী শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন। এ দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আমি যে তলায় ছিলাম, সেখানে ১২টি কক্ষ, একটি পাশে ছেলেদের ক্লাসরুম, অন্য পাশে মেয়েদের। সিঁড়ির দুই দিকেই শ্রেণিকক্ষ। নিচতলায় বাংলা মাধ্যম, দ্বিতীয় তলায় ইংরেজি। বিমানটি সোজা নিচতলার সিঁড়ির দিকেই আঘাত করে, এরপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে।
বাচ্চারা যখন গেট দিয়ে বের হলো, তখন আগুন ছিল একদম কাছাকাছি। তাপমাত্রা ছিল অসহনীয়, ধোঁয়ার কারণে নিশ্বাস নেওয়াও কষ্টকর। আরও দুই মিনিট দেরি হলে হয়তো কেউই বেঁচে ফিরতে পারত না। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
যারা হারিয়ে গেছে, তারা আর ফিরবে না। যারা এখনো লড়ছে, সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের জীবন ফিরিয়ে দেন—এই প্রার্থনাই করছি।
— মোহাম্মদ সায়েদুল আমীন
জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, ইংরেজি শাখা, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

Post a Comment