রোহিঙ্গা ঢলের আট বছর
সংকট গভীর হচ্ছে, সহযোগিতা কমছে
আট বছর কেটে গেল রোহিঙ্গা ঢলের। কিন্তু সংকট সমাধানের কোনো আলামত নেই, বরং পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকেই অবস্থান করা রোহিঙ্গা ও শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু মিলিয়ে এখন তাদের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ।
প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও ফিরতে পারেনি। রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় ফেরার সুযোগও দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর বিপক্ষে।
তহবিল ঘাটতি বাড়ছে
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে। ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই সংকট মোকাবেলায় ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার সহায়তা চাওয়া হলেও ১১ আগস্ট পর্যন্ত মিলেছে মাত্র ৩৩ কোটি ২ লাখ ডলার— যা লক্ষ্যকৃত তহবিলের মাত্র ৩৫%।
আগের বছরগুলোতে এ সহায়তা ছিল অনেক বেশি: ২০১৮ সালে ৭২%, ২০১৯ সালে ৭৫%, ২০২০ সালে ৬০%, ২০২১ সালে ৭৩%, ২০২২ সালে ৭০%, ২০২৩ সালে ৭১% এবং ২০২৪ সালে ৬৮%। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত এবং আফ্রিকার অস্থিরতার মতো বৈশ্বিক সংকট আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা ইস্যু দাতাদের মনোযোগ হারাচ্ছে।
মানবাধিকার সংকট
২০১৭ সালের হত্যাযজ্ঞের পর থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রিত হলেও মিয়ানমারে তাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চলছেই। রাখাইনে সেনা ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সংঘাতে রোহিঙ্গারা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু গত বছর বুথিডংয়ে প্রায় ৬০০ রোহিঙ্গা গণহত্যার শিকার হওয়ার প্রমাণ মেলে।
জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা রাখাইনে স্বাধীন তদন্ত দলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আদালত ইতোমধ্যেই মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ ২৫ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও এ–সংক্রান্ত প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি
কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে তহবিল সংকটে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। অপুষ্টি, ক্ষুধা, মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাড়ছে। বাংলাদেশ বারবার বলেছে, এই সংকট কেবল মানবিক নয়— এটি রাজনৈতিক। নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরানোই একমাত্র টেকসই সমাধান।
জাতিসংঘের সতর্কতা
রোহিঙ্গা ঢলের আট বছর পূর্তিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার দপ্তর বলেছে, “এই অপরাধের চক্র কবে থামবে? রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও সমতার অধিকার নিশ্চিত করাই জরুরি।” জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার টার্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

Post a Comment